বিনোদন

রাজনীতির কারণেই কী নন্দনে ঠাঁই পেল না ‘অপরাজিত’? ধুলো উড়ছে নন্দন চত্বরে, শহরের চারিদিকে বাজিমাত পর্দার ‘সত্যজিৎ’-এর

সত্যজিৎ রায় নিজের প্রথম ছবি ‘পথের পাঁচালী’ কীভাবে তৈরি করেছিলেন, কীভাবে এই ছবির মাধ্যমেই বাংলা চলচ্চিত্রে এক নবজাগরণের ঢেউ এসেছিল, কীভাবে এই ছবি গোটা বিশ্বকে বিস্মিত করে তুলেছিল, সেই কাহিনীর প্রেক্ষাপট নিয়েই তৈরি হয়েছে অনীকদত্ত পরিচালিত ‘অপরাজিত’। এই ছবিতে খোদ সত্যজিতের ভূমিকায় দেখা গিয়েছে জিতু কমলকে। গত শুক্রবারই মুক্তি পেয়েছে এই ছবি।

এই ছবি নিয়ে বিতর্কও চলেছে ঢের। না, বিতর্ক সত্যজিতের ভূমিকায় অভিনয় বা এই ছবিকে কেন্দ্র করে নয়। বিতর্ক ‘নন্দন’ প্রেক্ষাগৃহে এই ছবি স্থান না পাওয়া নিয়ে। সেই নন্দন, যার লেখাটাও সত্যজিতের কলম ধরেই সৃষ্টি, সেই নন্দন যা সত্যজিৎ রায় নিজের হাতে উদ্বোধন করেছিলেন। সেই নন্দনেই জায়গা পায়নি সত্যজিৎ রায়ের জীবনের এক অংশ নিয়ে তৈরি ছবিই।

সত্যজিতের সাধের নন্দনে বসে ‘অপরাজিত’ দেখবেন, এমন একটা স্বপ্ন অনেক দর্শকই দেখেছিলেন। ভাবলেই কেমন যেন একটা রোমহর্ষক ব্যাপার লাগে তাই না! কিন্তু তেমনটা আর হল কই। নন্দনে ‘অপরাজিত’র স্থান না পাওয়া একপ্রকার লজ্জা বলেই মত বাঙালি দর্শকের।

কেন নন্দনে স্থান হল না ‘অপরাজিত’র? এই প্রশ্নের কোনও উত্তর অবশ্য নন্দন কর্তৃপক্ষ বা সরকারের থেকে মেলেনি। এই নিয়ে সরকারকে কটাক্ষ করতেও ছাড়ে নি দর্শক। বেশিরভাগেরই মতে, পরিচালক অনীক দত্ত যেহেতু বর্তমান সরকার ও সরকার ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে বারবার সরব হয়েছেন, তারই ফলস্বরূপ তাঁর ছবিকে জায়গা দেওয়া হয়নি নন্দনে।

তবে এটা ভুললে চলবে না যে সম্প্রতি মুক্তিপ্রাপ্ত শিলাদিত্য মৌলিকের ছবি ‘হৃদপিন্ড’ও কিন্তু নন্দনে জায়গা পায়নি আবার কয়েক সপ্তাহ আগে ফিল্ম ফেস্টিভাল চলার কারণে নন্দনে জায়গা পায়নি অরিন্দম শীলের ‘মহানন্দা’ও। ‘মহানন্দা’ যার জীবনী নিয়ে তৈরি ছবি, সেই মহাশ্বেতা দেবী কিন্তু সরকার ঘনিষ্ঠ মানুষ ছিলেন। আর অরিন্দম শীল নিজেও তাই। তবু তাঁদের ছবি জায়গা পায়নি নন্দনে। কিন্তু দর্শক এসব যুক্তি মানতে নারাজ। সত্যজিত রায়ের জীবন নির্ভর ছবি সত্যজিতের প্রেক্ষাগৃহে জায়গা পাক, এটাই সকলের দাবী।

কিন্তু সে দাবী আর পূরণ হল কোথায়। সে সপ্তাহে ‘অপরাজিত’ মুক্তি পেল সেই সময় নুন্দনের নানান শো-তে চলছে মিমি অভিনীত ছবি ‘মিনি’, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের ছবি ‘অভিযান’, দেবের ছবি ‘কিশমিশ’ আর সোহম চক্রবর্তীর ‘কলকাতার হ্যারি’।

কিন্তু এত বড় স্টারদের ছবি চলা সত্ত্বেও নন্দন চত্বরে উড়ছে ধুলো। দর্শকের দেখা নেই। থাকবেই বা কী করে। সকলেই তো লাইন দিয়েছেন শহরের নানান মাল্টিপ্লেক্স থেকে শুরু করে প্রিয়া, অজন্তা, স্টার থিয়েটারের মতো প্রেক্ষাগৃহে। কেন? অবশ্যই সত্যজিতের টানে। মানে ‘অপরাজিত’র টানে। নন্দনে জায়গা না পেলেও, শহরের বাকি প্রেক্ষাগৃহে রমরমিয়ে চলছে এই ছবি তাও আবার হাউজফুল। আর এই ছবি ফের একবার প্রমাণ করে দিয়েছে যে স্টার নয়, বাংলা ছবি এগিয়ে নিয়ে যেতে কনটেন্টই শেষ কথা।  

হ্যাঁ, এবার প্রসঙ্গ উঠতেই পারে যে সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে বাঙালির আলাদা একটা আবেগ রয়েছে, তাই এই ছবিব দেখতে এত উচ্ছ্বাস। তা তো বটেই, তিনি যে সত্যিই বাঙালির মণিকোঠায় বসবাস করেন, তা তো আলাদা করে বলার প্রয়োজনই পড়ে না। কিন্তু সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে তো এর আগেও অনেক কাজ হয়েছে, কিন্তু এমন দৃষ্টান্ত কমই চোখে পড়েছে।

সত্যজিতের কথা উঠলেই বাঙালি তা পরখ না করে গ্রহণ করে না। এক্কেবারে যাকে বলে চুলচেরা বিশ্লেষণ। আর সবাই এরই সঙ্গে তাই জিতু কমলের লুক ও অভিনয়কে এককথায় মান্যতা দিয়েছে। তাই নন্দনের জায়গা না হলেও টিকিট কেটে অন্যান্য সিনেমা হলে দৌড়চ্ছে দর্শক।

তবে এত কিছুর পরও কী নন্দন কর্তৃপক্ষ ‘অপরাজিত’কে নিয়ে সিদ্ধান্ত বদল করবে? তা তো এই শুক্রবারই দেখা যাবে। এদিকে, এই শুক্রবার আবার মুক্তি পাচ্ছে শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায়ের ‘বেলাশুরু’। সেই ছবি যে নন্দনে থাকবে, তা জানাই। সেই ছবির গানও মুক্তি পেয়েছে নন্দন চত্বরেই। তবে ‘অপরাজিত’ নিয়ে নন্দন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত কি হয়, এখন সেটাই দেখার।

Related Articles

Back to top button