সব খবর সবার আগে।

ছোট্ট বয়সে বলিউডে পা, অসুখী দাম্পত্য জীবন, পুরুষশাসিত ইন্ডাস্ট্রিতে লড়াই করে জাতীয় পুরস্কার জয়, রইল অনন্য সরোজের কাহিনী

নির্মলার নির্মল নাচের ছন্দে গোটা দুনিয়া মাত। কিন্তু ৭১ বছর বয়সে হৃদরোগে থেমে গেল তাঁর ঘুঙুরের বোল। আপনি চিনতে পারছেন না তাইতো? কিন্তু আমি যদি বলি নির্মলার আসল নাম সরোজ খান তখনই আপনি বুঝতে পারবেন আমি ভারতের কোন কিংবদন্তি নৃত্যশিল্পীর কথা বলছি। গতকাল ৭১ বছর বয়সে পৃথিবীকে বিদায় জানালেন ‘মাদার অফ কোরিওগ্রাফি’।

১৯৪৮ সালের ২২শে নভেম্বর পাকিস্তানের জন্ম সরোজের। এরপর দেশভাগের করুণ পরিণতিতে মা-বাবার সঙ্গে মহারাষ্ট্র চলে আসা। কিষণচন্দ সাধু সিংহ এবং ননী সাধু সিংহের মেয়ে নির্মলা পরবর্তীকালে স্বেচ্ছায় ধর্মান্তরিত হন।

বছর তিনেক বয়স থেকেই গানের সঙ্গে হাত পা নাড়ত ছোট্ট সরোজ। সেই দেখে তাঁর বাবা-মা ভয় পেয়ে তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান যে মেয়ের কোন অসুখ হল নাকি? ডাক্তার অবশ্য তার অসুখ ধরে দেন, জানিয়ে দেন যে, এই মেয়ে নাচ করতে চায়, ওকে ফিল্মি লাইনে নিয়ে যেও অনেক নাম করবে। পরে এই ডাক্তারই সরোজকে নিয়ে যান মুম্বাইয়ের ফিল্মি দুনিয়ায়।

 

দেহের ওজন ছোটবেলা থেকেই গড়পড়তার থেকে অনেকটাই বেশি ছোট থেকেই উনি ডাকনাম পেয়ে গিয়েছিলেন মোটি বাচ্চি। কিন্তু ওই মোটি বাচ্চি যে একদিন নাচের দুনিয়ায় একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করবেন একথা কেউ বোধহয় ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি।

সরোজের কেরিয়ার শুরু হয়েছিল অভিনয় দিয়ে। তিন বছর বয়সি নির্মলাকে পর্দায় প্রথম দেখা গিয়েছিল ‘নজরানা’ ছবিতে। ছবির নায়িকা শ্যামার শৈশবের ভূমিকায় দেখা গিয়েছিল তাঁকে। এরপর পঞ্চাশের দশকে বলিউড সিনেমার দুনিয়ায় সরোজকে আবার দেখা গেল। কিন্তু এবার তিনি ব্যাকগ্রাউন্ড ডান্সার হিসেবে আসলেন।যখন বলিউডে আসেন তখন নির্মলা থেকে রুপোলী পর্দায় তাঁর নতুন নাম হল বেবি সরোজ।১৯৫৩ সালের ছবি ‘আগোস’-এ বেবি নাজ আর বেবি সরোজ ছিল শিশুশিল্পী ডান্সার রাধা কৃষ্ণর রোলে। এই নাচের গান গেয়েছিলেন লতা মঙ্গেশকর আর সুধা মালহোত্রা।

প্রথম গ্রুপ ডান্সার হিসেবে সরোজের কাজ মধুবালার গানে। শক্তি সামন্তর ‘হাওড়া ব্রিজ’ ছবিতে মধুবালার লিপে গান ‘আইয়ে মেহেরবান। ওই ক্যাবারে গানেই গ্রুপ ডান্সার হিসেবে টুপি পরে একটি ছেলের ভূমিকায় নাচ করেন সরোজ। ওই গানে যে সরোজ খান পুরুষবেশে ছিলেন, তা অনেকেই জানেন না।

এরপরে বলিউডের তখনকার নামকরা ডান্স কোরিওগ্রাফার বি সোহনলালের কাছে কত্থকের তালিম নিতে শুরু করেন সরোজ। মাত্র তের বছর বয়সেই বিয়ে করলেন চল্লিশ পার হওয়া সোহনলালকে। কিন্তু তাঁর দাম্পত্য জীবন সুখের হয়নি। সোহনলালের যে তিনি দ্বিতীয় স্ত্রী একথা তিনি জানতেন না। এছাড়াও তাঁদের সন্তানকে স্বীকৃতি দিতে চাইছিলেন না সোহনলাল। আর সরোজ যে বলিউডে কোরিওগ্রাফি করবেন এই বিষয়ে সায় দিচ্ছিলেন না খোদ কোরিওগ্রাফার স্বামী! সিঙ্গেল মাদার হিসেবে যাত্রা শুরু হল সরোজের।

সরোজ খানকে সুযোগ দিলেন নায়িকা সাধনা। সাধনার প্রোডাকশনের ছবি “গীতা মেরা নাম” চলচ্চিত্রে সরোজ নিজে কোরিগ্রাফার হিসাবে আত্মপ্রকাশ করলেন ১৯৭৪ সালে। শুরু হলো বলিউডের কোরিওগ্রাফির অন্যতম এক ঘরানা।

শরীর প্রদর্শন না করেও যে শরীর ভঙ্গিমাতেই মাত করে দেওয়া যায় আসমুদ্রহিমাচল শিখিয়েছেন পৃথ্বুলা এই নারী। কিন্তু একে ওজন বেশি তার উপর মহিলা, এইরকম কোরিওগ্রাফারকে বলিউডের পুরুষ কোরিওগ্রাফাররা জায়গা ছাড়তে তখন নারাজ ছিলেন। কিন্তু প্রতিভা তার নিজের জায়গা ঠিকই ছিনিয়ে নেয়। ধর্মেন্দ্র হেমা মালিনী প্রতিজ্ঞা সিনেমা ব্রেক পান সরোজ। এরপর আসল শ্রীদেবী ও মাধুরীর যুগ। মিঃ ইন্ডিয়ার হাওয়াহাওয়াই হোক তেজাব এর এক দো তিন, শ্রীদেবী মাধুরীর শরীরে হিল্লোলে তখন কাত গোটা ভারত।

বেটা সিনেমা মাধুরীর ধক ধক করনে লাগা গানটি নিয়ে প্রথমে আপত্তি তোলেন জুরিবোর্ডের সদস্যা এক মহিলা। কিন্তু সরোজ সাফ জানিয়ে দেন যে বুক ধক ধক করছে সেটা বাইরে থেকে নাচের মাধ্যমে আর কীভাবে বোঝানো যাবে? এই গানে কিন্তু মাধুরীকে কোনও অশ্লীল পোশাক পরানো হয় নি। তারপর তো ইতিহাস।

মাধুরীর সঙ্গে তখন সরোজ খানের নাম এক সঙ্গে উচ্চারিত হত। এই জুটির একের পর এক পারফরম্যান্সে দিওয়ানা হয়ে ওঠেন সবাই। ‘ডর’, ‘বাজিগর’, ‘ইয়ারানা’, ‘মোহরা’, ‘দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে যায়েঙ্গে’, ‘খামোশি দ্য মিউজিক্যাল’, ‘পরদেশ’, ‘সোলজার’, ‘লগান’, ‘স্বদেশ’, ‘বীর জারা’, ‘যব উই মেট’’, ‘লভ আজ কাল’, ‘এজেন্ট বিনোদ’, ‘হম দিল দে চুকে সনম’, ‘দেবদাস’ ইত্যাদি অসংখ্য বক্সঅফিস সফলতা তার কোরিওগ্রাফির মৌলিক মণিমুক্তো তিনি ছড়িয়ে গিয়েছেন।

২০১৯-এ মুক্তি পাওয়া ‘কলঙ্ক’-এ শেষ বারের মতো কোরিয়োগ্রাফি করেন সরোজ। ছোট পর্দাতে তাঁর ‘নাচ লে ভি উইথ সরোজ খান’ অনুষ্ঠান দেখে ভারতের তামাম কিশোরী থেকে তরুণীরা ঘরেই নাচ তুলতে বাকি রাখেনি। ‘দেবদাস’, ‘জব উই মেট’ এবং তামিল ছবি ‘শৃঙ্গারম’-এর জন্য তিন বার সম্মানিত হয়েছেন জাতীয় পুরস্কারে।

বাংলার সঙ্গেও যোগ ছিল কিংবদন্তি এই নৃত্য শিল্পীর। কলকাতার ডান্স রিয়েলিটি শো ‘ডান্স পে চান্স টলি ভার্সেস বলি’তে বিচারক হয়ে আসেন সরোজ খান। এছাড়াও ২০১৬ সালে অরিন্দম শীল পরিচালিত বাংলা ছবি ‘ব্যোমকেশ পর্ব’-র গোলাপবাঈ-এর মেহেফিলের জন্য সায়ন্তিকা বন্দোপাধ্যায় কে নাচ শেখানোর জন্য আসেন সরোজ খান।

তথাকথিত সুন্দরী, লাস্যময়ী এবং ছিপছিপে গড়নের অধিকারী না হয়েও যে নাচের মুদ্রার জোরে ও অভিব্যক্তির প্রকাশে গোটা দুনিয়াকে মাত করে দেওয়া যায় তা প্রমাণ করে গিয়েছেন সরোজ খান। ওই পারে গিয়ে তিনি ভাল থাকুন, খবর ২৪×৭ এর পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য রইল।

Leave a Comment