সব খবর সবার আগে।

চলে যাওয়ার চল্লিশ বছর, তবু এখনও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক চিরনায়ক উত্তমকুমার

তাঁকে দেখে প্রেমে পড়তে শিখেছিল বাঙালি। ‘দৃষ্টিদান’ দিয়ে রুপোলি পর্দায় পা রাখা, প্রথমেই আসেনি কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। লড়াই করে টিকে থেকে বাংলার মহানায়ক রূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠা। তিনি উত্তমকুমার। আজ তাঁর চল্লিশতম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৮০ সালের ২৪শে জুলাই বেলভিউ ক্লিনিকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন বাংলার মহানায়ক। কেঁদে উঠল বাঙালি। মাত্র ৫৪ বছর বয়সে শেষ হল বাংলার অন্যতম কিংবদন্তির জীবন। আজ তাঁর প্রয়াণের চল্লিশ বছরে পরেও তিনি সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

সাদামাঠে চরিত্রে বাস্তবসম্মত অভিনয়; এই ছিল অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায় তথা উত্তমকুমারের বৈশিষ্ট্য। আটপৌরে ঘরানায় যেন মিশে থাকত জাত অভিনয়ের ছাপ। কিন্তু মানুষটার দুঃখ ছিল একটাই, তাঁকে খুব বেশি পরীক্ষা নিরীক্ষা করাল না কেউ। রোমান্টিক রোলেই তাঁকে দেখতে পেল দর্শক। অথচ তাঁর অভিনয় প্রতিভা প্রশ্নাতীত। বাণিজ্যিক ছবিতেও তিনি যে কী দক্ষ ও সংযত অভিনয় করতেন তা তাঁর সপ্তপদী, হারানো সুর, সাড়ে চুয়াত্তর ছবিগুলো দেখলেই স্পষ্ট হয়ে যাবে।

প্রথমদিকে অভিনয়ের কিছু খামতি থাকলেও পরবর্তীতে উত্তমকুমার অভিনয়ের অতিনাটকীয়তা অনেকটাই সরে এসেছিলেন। গান গাওয়ার সময় শুধু লিপসিঙ্ক, কোন বডি মুভমেন্ট নেই অথচ তাতেই কি সাধারণ রাজকীয়তা ফুটে উঠছে চরিত্রে। না আছে কোনো সাজপোশাকের আড়ম্বরতা, না কোনো জাঁকজমক ব্যাকগ্রাউন্ড সেট। রাজেশ খান্না বলেছিলেন, ” সিনেমার প্রকৃত প্রতিনিধি হলেন উত্তম কুমার। ধুতি-পাঞ্জাবির মত ভারতীয় সংস্কৃতিকে আর কেউ তাঁর মত বহন করতে পারেনি।”

সুচিত্রা সেন, সুপ্রিয়া চৌধুরী, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, মালা সিনহা, মাধবী মুখোপাধ্যায় শর্মিলা ঠাকুর, অঞ্জনা ভৌমিক, তনুজা সমর্থ অপর্ণা সেন, সুমিত্রা মুখার্জি, সন্ধ্যা রানী অরুন্ধতী দেবী, কাবেরী বোস এর মত নায়িকাদের সঙ্গে একের পর এক জুটি বেঁধে সফল সিনেমা বাঙালি দর্শককে উপহার দিয়ে গিয়েছেন মহানায়ক। তার মধ্যে উত্তম-সুচিত্রা জুটির অমরত্ব নিয়ে কোন প্রশ্ন তোলা যাবে না। এই জুটির অভিনীত সাড়ে চুয়াত্তর, অগ্নিপরীক্ষা, শিল্পী, সপ্তপদী, পথে হল দেরি, হারানো সুর, চাওয়াপাওয়া, জীবন তৃষ্ণা, ইন্দ্রাণী এছাড়াও আরও বিভিন্ন ছবি দর্শকদের মন জয় করেছিল এবং সেই ধারা এখনো বর্তমান।

এছাড়াও সুপ্রিয়া দেবী ও সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গেও উত্তম কুমারের জুটির মানুষের মনে ধরেছিল।তবে শুধু রোমান্টিক অভিনয় নয়, পরবর্তীকালে তাঁর অভিনয় প্রতিভার কিছুটা কদর দিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায় তাকে দুটি ভিন্নধারার চরিত্রে অভিনয় করিয়ে। সত্যজিৎ রায়ের নায়ক ও চিড়িয়াখানাতে উত্তম কুমারের অভিনয় একজন খাঁটি বাঙালি কোনদিনও ভুলবে না। বাংলা সিনেমা ছাড়া উত্তম কুমার কিন্তু নিজের অভিনয় কেরিয়ারে ১৫ টি হিন্দি সিনেমাতে অভিনয় করেছিলেন। ছোটিসি মুলাকাত তাঁর অভিনীত অন্যতম উল্লেখযোগ্য হিন্দি ছবি।

যদিও জীবনের অধিকাংশ ছবিতেই বাঁধাগতে অভিনয় করে যাওয়ার তাঁর আক্ষেপ জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ছিল। তিনি একটি সাক্ষাৎকারে বলেই ফেলেছিলেন যে, “দর্শকের অসীম ধৈর্য আমার এই বয়সে এখনো তারা আমাকে রোমান্টিক নায়করূপে সহ্য করছেন। একেক সময় মনে হয় তাদের প্রতি আমি অবিচার করছি।”

শোনা যায়, ১৯৮০ সালে ওগো বধূ সুন্দরী ছবির সেটে হৃদরোগে আক্রান্ত হন মহানায়ক। তাকে তৎক্ষণাৎ বেলভিউ ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। ডাক্তাররা ১৬ ঘন্টা চেষ্টা করেন তবুও বাঁচাতে পারেন না মহানায়ককে। বাংলা সেইদিন হারিয়েছিল তাঁর অন্যতম প্রতিভাকে। বেলভিউ ক্লিনিক থেকে যখন তাঁর বাসভবন ভবানীপুর হয়ে কেওড়াতলা মহাশ্মশানে মহানায়ককে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সেইদিন গোটা কলকাতা ভেঙে পড়েছিল রাস্তায় শুধু তাদের প্রিয় মহানায়ককে একবার দেখবে বলে।

আজও মহানায়ককে অবলম্বন করে তৈরি হচ্ছে কতশত কনটেন্ট। তার স্টাইল অনুকরণ এখনো করে যুবসমাজ। তিনি চির অমর, তিনি আমাদের চির নায়ক। খবর ২৪×৭ এর পক্ষ থেকে তাঁর চল্লিশতম প্রয়াণবার্ষিকীতে রইল অপার শ্রদ্ধার্ঘ্য।

Comments
Loading...
Share