সব খবর সবার আগে।

প্রিয় নরেন থেকে জগৎ শ্রেষ্ঠ স্বামী বিবেকানন্দ হয়ে ওঠার সফরসঙ্গী হলো আঁটপুর! জেনে নিন হুগলি জেলার এই অখ্যাত গ্রামের ইতিহাস!

টেরাকোটা মন্দির বা টেরাকোটা শিল্প বললে প্রথমেই আমাদের মনে আসে বাঁকুড়া-বিষ্ণুপুরের কথা। কিন্তু কলকাতা থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে হুগলী জেলাতেই রয়েছে তৎকালীন বাংলাদেশ অধুনা বাংলার টেরাকোটা শিল্পের অন‍্যতম পীঠস্থান আঁটপুর। তবে শুধু টেরাকোটা শিল্পের জন‍্যই নয় হুগলী জেলার এই ছোটো, আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ, নিরিবিলি গ্রাম আঁটপুর পূর্বাতন বাংলার এক প্রাচীন জনপদও বটে। বলা হয় এই অঞ্চলের জমিদার আঁটুর খাঁর নামানুসারে এখানকার নাম হয় আঁটপুর। ইতিহাস বিখ‍্যাত সিল্করূট বা রেশমি পথও এই অঞ্চলের ওপর দিয়েই গেছে।

 

সেই প্রাচীন যুগ থেকে তাঁত শিল্প‌ই এখানকার মানুষদের প্রধান জীবিকা। প্রায় প্রত‍্যেক ঘরেই তাঁত বোনা হয়। এখানকার তাঁতের শাড়ির কদর সারা দেশে আছে। বলা হয়ে থাকে বাঙালির আটপৌরে শাড়ির ধারনাও এই আঁটপুর থেকেই এসেছে। অর্থনৈতিক ও পরমার্থিক উভয় ঐশ্বর্যের জৌলসে আঁটপুর একসময়ে এই জেলার উজ্জ্বল গ্রাম বলে বিবেচিত হত।

 

এই জনপদের সাংস্কৃতিক গুরুত্ব এতটাই যে ‘বৈষ্ণবাচারদর্পন’ এবং ‘ভক্তিরত্নাকার’ গ্রন্থে এই জনপদের বিশেষভাবে উল্লেখ পাওয়া যায়। অনুমান করা হয় আলোচ‍্য গ্রাম একসময়ে বিখ‍্যাত ভুরিশ্রেষ্ঠ রাজ‍্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। মুসলমানদের আগে পাঠান আমলে ভুরিশ্রেষ্ঠ রাজ‍্য হাওড়া, হুগলী ও মেদিনীপুর জেলার অনেকটা অংশ নিয়ে গড়ে উঠেছিল। এই রাজ‍্যের রাজধানীর নাম ছিল ভুরিশ্রেষ্ঠ যা বর্তমানে ভুরশুট নামে পরিচিত। এই ভুরশুট গ্রাম অবশ‍্য আঁটপুর থেকে খুব বেশি দূরে নয়। ভুরিশ্রেষ্ঠ রাজ‍্য পাঠান আমলে সম্পূর্ণ স্বাধীন ছিল এবং মুঘল আমলে দিল্লির দরবারে নজরানা পাঠানো হলেও কার্যত ভুরিশ্রেষ্ঠ স্বাধীনই ছিল। তবে আঁটপুরে ভুরিশ্রেষ্ঠ রাজ আমলের কোন প্রাচীন কীর্তি তেমনভাবে চোখে পড়েনা। বা থাকলেও আজ তা নষ্টের পথে। আঁটপুরের অনেক দর্শনীয় জিনিসের মধ‍্যে উল্লেখযোগ‍্য হল মিত্র বাটীর রাধাগোবিন্দ জিউর মন্দির।

১৭৮৬ সালে তৎকালীন বর্ধমানের দেওয়ান কৃষ্ণরাম মিত্র প্রথম এই মন্দির নির্মান করেন। বাংলায় সুলতানি শাসনের এক চূড়ান্ত সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে এই মন্দির নির্মান করা হয়। একদিকে সুলতানী শাসন তো অন‍্যদিকে ফরাসী, ডাচ, পর্তুগিজ, দিনেমারদের আক্রমনে দিশেহারা হয়ে পড়েছিল এই জেলার হিন্দু সম্প্রদায়। হুগলী এক সময় সুক্ষভূমি নামে পরিচিত ছিল। প্রথম পাশ্চাত‍্য সভ‍্যতার বিকাশ সাধিত হয়েছিল এখানেই।

কলকাতায় ইংরেজ কলোনি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অনেক আগে জব চার্নক প্রথম চেষ্টা করেছিলেন এই হুগলীতে। ব‍্যাপক হারে ধর্মান্তকরণ শুরু হয়েছিল সেই সময়। তাই এই মন্দির নির্মানের পিছনে লক্ষ‍্য ছিল হিন্দু জাতিকে আনুপ্রাণিত করা। নিজেদের ধর্মের প্রতি বিশ্বাস ফিরিয়ে আনার তাগিদেই এই মন্দিরের গাত্রে গাত্রে খোদাই করা হয় রামায়ন, মহাভারত। পোড়ামাটির ভাস্কর্য এবং বিষয়বস্তুর বৈচিত্রতা মুগ্ধ হওয়ার মতো। সেই সময়কার গ্রাম বাংলার চিত্র, ফিরিঙ্গি বণিক, যুদ্ধের বিভিন্ন দৃশ‍্য, হিন্দু সংস্কৃতির ন‍্যায় মুসলমান সংস্কৃতিসহ বেশ কিছু উপাদানের সমন্বয় দেখা যায়। এবং তা আজও অক্ষত অবস্থায় আছে মন্দিরের দেওয়ালে।

এই গ্রামের সঙ্গে বাংলার ইতিহাস অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তবে আঁটপুর যে যে কারণে প্রসিদ্ধ তার অন‍্যতম কারণ হলো এই স্থান শ্রী রামকৃষ্ণদেবের শিষ‍্য এবং স্বামী বিবেকানন্দের গুরুভ্রাতা স্বামী প্রেমানন্দের জন্মস্থান।

ভবিষ‍্যৎ ভারত তৈরির সূত্রপাত এই আঁটপুরেই হয়েছিল এই কথা বলাই যায়। স্বামী প্রেমানন্দের বা বাবুরাম ঘোষের মা মাতঙ্গিনী দেবীর আহ্বানে আঁটপুরে ঘুরতে এসে নরেন্দ্রনাথ সহ আরও আটজন গুরুভ্রাতা ১৮৮৬ খ্রীস্টাব্দের ২৪ শে ডিসেম্বরের রাতে ঘোষেদের দুর্গাদালানের সন্নিকটে ধুনি জ্বালিয়ে চূড়ান্ত ত‍্যাগের মাধ‍্যমে রামকৃষ্ণদেবের আদর্শকে ছড়িয়ে দেবার সংকল্প গ্রহণ করেন এবং সন্ন‍্যাসী হন। এই আঁটপুরেই নরেন পরিচয় বদল করেন এবং স্বামী বিবেকানন্দ হিসাবে জগতে পরিচিতি পান।

শুধুমাত্র স্বামী বিবেকানন্দই নন শ্রীমা এবং রামকৃষ্ণদেবও বেশ কয়েকবার এই গ্রামে এসেছেন। বর্তমানে ঘোষেদের বাড়িটি রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের অধীন। এখানে পর্যটকের থাকার সু-ব‍্যাবস্থাও আছে। ইতিহাস ভারাক্রান্ত এই গ্রাম আপনাকে মোহিত করবেই।

Comments
Loading...
Share