কলকাতা

রানি রাসমনির দেওয়া জমিতেই বাগান তৈরি হয় ব্রিটিশ বোনেদের, সেই বাগানই আজ পরিচিত ইডেন গার্ডেনস নামে

জঙ্গলের পাশ দিয়ে বয়ে যেত হুগলী নদী, সেখানে আবার দস্যুদের ভয়। প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে এই জলপথেই ব্যবসা চালাত ব্যাপারীর নৌকো, জাহাজগুলি। সেরকমই এক পরিবেশে গড়ে উঠল এক মনোরম উদ্যান, যার নাম ‘ইডেন গার্ডেনস’। আর এই কৃতিত্বের নেপথ্যে ছিলেন দুই ব্রিটিশ বোন।

জঙ্গলভরা এলাকার পাশে বয়ে চলা হুগলি নদীতে ছিল দস্যুর ভয়। এমন এক পরিবেশেই ধীরে ধীরে ব্রিটিশদের হাতে রূপান্তরিত হয় কলকাতা। ব্রিটিশ প্রশাসকদের মধ্যে অন্যতম লর্ড অকল্যান্ড। ১৮৩৬ থেকে ১৮৪২ অবধি ভারতের গভর্নর জেনারেল ছিলেন তিনি। পোশাকি ভারী পরিচয় ‘ফার্স্ট আর্ল অব অকল্যান্ড’-এর আড়ালে চাপা পড়ে গিয়েছিল তাঁর প্রকৃত নাম, জর্জ ইডেন।

সেই সময় কলকাতায় এসে বেশ সমস্যায় পড়েছিলেন লর্ড অকল্যান্ডের দুই বোন। কিছুতেই এই পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছিলেন না তারা। তাদের অভ্যাস ছিল সান্ধ্যভ্রমণে বেরনোর। এই কারণে সেই জঙ্গলে ভরা পরিবেশকেই দুই বোন চাইলেন বেশ সুন্দর করে সাজিয়ে তুলতে। অভিজাত মহলে এই দুই বোন পরিচিত ছিলেন ‘মিস ইডেন’ বলে। তাদের ইচ্ছাতেই কলকাতার এই বিস্তীর্ণ অংশে তৈরি হয় ফুলের বাগান, পামগাছের সারি, ফোয়ারা।

আজকের এই কলকাতা ময়দান উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় ছিল ঘন জঙ্গল। সেখানে তখন জনৈক ঘাট ছিল চাঁদপাল ঘাট। সেই সময় এই ঘাটেই এসে নামতেন ব্রিটিশরা। তাদের কাছে ইডেন বোনদের এই উদ্যান ছিল ফুসফুসে অক্সিজেন পৌঁছনোর মতো।

প্রথমে লোকমুখে এর নাম হয় ‘লেডি বাগান’। পোশাকি নাম ছিল ‘অকল্যান্ড সার্কাস গার্ডেন’। ১৮৫৬ সালে নাম দেওয়া হয় ‘ইডেন গার্ডেন্স। ১৮৬৫ থেকে ১৮৭১ অবধি এই উদ্যানের সংস্কারসাধন হয়। তবে ইডেন তৈরির আগেও কলকাতায় ক্রিকেট খেলা হত। ১৮২৫ সালে থেকে ক্রিকেট খেলা হত ‘ক্যালকাটা ক্রিকেট ক্লাব’এ। ইডেন উদ্যানের একটি বড় অংশ নিয়ে পরবর্তী কালে তৈরি হয় আকাশবাণী ভবন এবং নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়াম। বাকি অংশ পড়ে থাকে লর্ড অকল্যান্ডের দুই বোনের স্মৃতি নিয়ে।

১৮৮০ সালের আগে ইডেন উদ্যানে ঢোকার জন্য প্রবেশমূল্য দিতে হত। তবে ব্রিটিশ সমাজের মান্যগণ্য ব্যক্তি সেটন কার সেই প্রবেশমূল্য দিতে অস্বীকার করেন। নিজের দাবীর পিছনে সেটনের যুক্তি ছিল, ইডেন উদ্যান ছিল ব্যক্তিগত সম্পত্তি। শোনা যায়, লর্ড অকল্যান্ডের দুই বোনকে হুগলি নদীর ধারে নিজের বাগান উপহার দিয়েছিলেন রানি রাসমণির স্বামী, জমিদার বাবু রাজচন্দ্র দাস। পরে সেই বাগানই মনের মতো করে সাজিয়ে তুলেছিলেন মিস ইডেন-রা। ফলে বন্ধ করা গিয়েছিল প্রবেশমূল্য। কিংবদন্তি যা-ই হোক না কেন, এই উদ্যানের কৃতিত্ব দুই ব্রিটিশ নারীর।

ব্রিটিশ কলকাতায় ইডেনকে বলা হত ‘প্রমেনাদ’ অর্থাৎ যেখানে অলস ভাবে হেঁটেচলে বেড়ানো যায়। ১৭৯ বছর আগে এই জায়গায় ব্রিটিশ সাহেব ও কলকাতার বাবুরা যখন ভ্রমণ করতেন, সেই সময় বাজত ব্যান্ড। লর্ড ডালহৌসির শাসনকালে তৎকালীন বর্মার বৌদ্ধ প্যাগোডার পরিবর্তিত ঠিকানা হয় ইডেন উদ্যান। বর্মার প্রোম থেকে জাহাজে করে ইডেন উদ্যানে নিয়ে আসা হয় ‘প্যাগোডা’।

১৮৪৩ সালে লর্ড অকল্যান্ড তাঁর উত্তরসূরি লর্ড এলেনবরোর হাতে দায়িত্বভার তুলে দিয়ে ইংল্যান্ডে ফিরে যান। ১৮৪৯ সালে মৃত্যু হয় তাঁর। তবে কলকাতার বুকে আজও রয়ে গিয়েছে তাঁর নন্দনকানন, ইডেন গার্ডেনস।

Related Articles

Back to top button