সব খবর সবার আগে।

স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার প্রথম মহিলা শহিদ, ইংরেজদের হাতে ধরা না পড়তে চেয়ে পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মঘাতী হন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার

ইতিহাসের পাতায় নানান স্বাধীনতা সংগ্রামীর কথা আমরা পড়েছি যারা দেশের জন্য নিজেদের প্রাণ বলি দিতে দু’বার ভাবেন নি। এমন অনেক বাংলার বিপ্লবীদের কথাও ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে যারা স্বাধীনতার দাবীতে নানান আত্মত্যাগ করেছেন।

কিন্তু তবুও এমন বেশ কিছু স্বাধীনতা সংগ্রামীদের রয়েছে যাদের কথা অনেকেই জানেন না বা তাদের বিষয়ে সেভাবে ইতিহাসের পাতাতেও সেভাবে লেখা নেই, যারা দেশের জন্য, নিজের মাতৃভূমির জন্য প্রাণ ত্যাগ করেছেন। এঁদের মধ্যেই অন্যতম হলেন বাংলার প্রথম মহিলা শহিদ প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার।

১৯১১ সালের ৫ই মে বর্তমান বাংলাদেশের চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। বাবা জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার ছিলেন মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের সামান্য চাকুরে, মা ছিলেন প্রতিভা দেবী। সংসারে হাজার অভাব অনটনের মধ্যেও নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যান প্রীতিলতা। ১৯২৭ সালে তিনি ম্যাট্রিক্স পরীক্ষা দেন। কলকাতায় বেথুন কলেজে দর্শন শাস্ত্রে ডিগ্রী লাভ করেন তিনি।

পড়াশোনা করার সময়ই তাঁর পরিচয় হয় অন্য এক মহিলা বিপ্লবী লীলা নাগের সঙ্গে। এরপর তাঁর নেতৃত্বাধীন দল দীপালি সংঘে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সঙ্গে যোগ দেন প্রীতিলতা। ধীরে ধীরে পরিচয় হয় মাস্টারদা সূর্য সেনের সঙ্গে। তাঁর সঙ্গে দেশের কাজে নিজেকে নিয়োগ করেন প্রীতিলতা।

মাস্টারদা বুঝেছিলেন যে একজন মহিলার হাত দিয়ে যদি বিপ্লবীদের অস্ত্র পাচার করানো হয় তাহলে ধরা পরার ভয় কম। ১৯৩০ সালে চট্টগ্রামের অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের সময় বড় ভূমিকা পালন করেন প্রীতিলতা। সেই সময় বিপ্লবীরা নিজেদের এই কর্মকাণ্ডে সফল না হলেও প্রীতিলতা কিন্তু সমস্ত টেলিফোন লাইন কেটে ও টেলিগ্রাফের সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে নিজের কাজ বেশ সাফল্যের সঙ্গেই পালন করেন।

সেইব সময় তিনি মাস্টারদা ছাড়াও অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন বিপ্লবী রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের দ্বারা। ১৯৩০ সালের ২রা ডিসেম্বর রামকৃষ্ণ বিশ্বাস চাঁদপুর রেলস্টেশনে মিঃ ক্রেগের পরিবর্তে ভুল করে চাঁদপুরের এস ডি ও তারিণী মুখোপাধ্যায়কে হত্যা করেন। বিচারে ফাঁসি হয় রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের। আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে ছিলেন তিনি। জানা যায় সেই সময় প্রীতিলতা ছদ্মবেশে মৃত্যু পথযাত্রী রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের সঙ্গে জেলে কমপক্ষে চল্লিশ বার দেখা করতে গিয়েছিলেন।

জানা যায়, দুর্গাপুজোর সময় পাঁঠাবলি দেওয়ার ঘটনার তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন প্রীতিলতা। সেই সময় তাঁর দলেরই লোকজন তাঁর দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁকে প্রশ্ন করা হয় তিনি কী আদৌ তাঁর দেশের স্বাধীনতার জন্য চরমপন্থা অবলম্বন করতে চান কী না। এই প্রশ্নের উত্তরে প্রীতিলতা জবাব দেন, “আমি যেমন দেশের জন্য আমার জীবন দিতে পাড়ি, তেমনিই প্রয়োজন হলে দেশের জন্য কারোর প্রাণ নিতেও আমি দু’বার ভাবব না”। এই ঘটনা থেকেই বোঝা যায় দেশেকে ইংরেজদের হাত থেকে রক্ষা করার আগুন কীভাবে জ্বলছিল প্রীতিলতার বুকে।

১৯৩২ সালে ১৩ই জুন একটি বৈঠক করেন মাস্টারদা সূর্য সেন। সেই সময় পাহাড়তলিতে একটি ইউরোপিয়ান ক্লাব ছিল যার বাইরে একটি সাইনবোর্ডে লেখা থাকত, “কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ”। এই ক্লাবেই লুট করার পরিকল্পনা করেন মাস্টারদা। এই কাজের প্রধান দায়িত্বে ছিলেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। চল্লিশ জনের একটি দল গঠন করা হয়।

প্রীতিলতা পাঞ্জাবী পোশাকে সেজে বাকী বিপ্লবীদের সঙ্গে ২৩শে সেপ্টেম্বর রাতে উপস্থিত হন সেই ইউরোপিয়ান ক্লাবে। ১০টা ৪৫ মিনিট নাগাদ ওই ক্লাবে শুরু হয় বোমাবাজি ও গুলিবর্ষণ। আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় ক্লাবে। পাল্টা গুলি চালাতে থাকে ইংরেজ পুলিশও। এই ঘটনায় এ মহিলা-সহ চারজন শ্বেতাঙ্গের মৃত্যু হয়।

পুলিশের গুলিতে জখম হন প্রীতিলতা। পালিয়ে আসার সময় তখনও তাঁর শরীরে প্রাণ ছিল। কিন্তু ইংরেজদের হাতে ধরা পড়তে চান নি তিনি। তেমনটা হওয়া তাঁর কাছে ছিল লজ্জার সমান। এই কারণে নিজের কাছে থাকা পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মঘাতী হন প্রীতিলতা। মাত্র ২১ বছর বয়সে শহিদ হন তিনি।

তাঁর এই আত্মত্যাগের মাধ্যমে প্রীতিলতা বাংলার সমস্ত নারীকে বার্তা দিয়ে যান যে নারীরাও চাইলে পুরুষদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ চালাতে পারে। ইতিহাস থেকে এই সাহসী বিপ্লবীর কথা কখনও মুছে যেতে পারে না।

You might also like
Comments
Loading...