সব খবর সবার আগে।

প্রথমবার পেন্টুলুন পরে নিজেকে সঙ মনে হয়েছিল বিদ্যাসাগরের, বিধবাবিবাহ চালুর জেরে ধর্মক্ষয়ের করার ‘অপরাধে’ রোষের মুখে পড়েন সমাজের

১৩০২ বঙ্গাব্দের ১৩ই শ্রাবণ কলকাতার এমারল্ড থিয়েটারে অনুষ্ঠিত হয় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের স্মরণসভা। এই সভায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটি বক্তৃতা পাঠ করেন। সেখানে তিনি বিদ্যাসাগর ও রামমোহন রায়কে আদর্শ মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করেন। সেখানে তাদের দুটি প্রধান লক্ষণের কথা বলেন। একটি হল ব্যক্তিস্বাতন্ত্র ও অন্যটি সর্বজনীন মনুষ্যত্ব।

আঠারো শতকের শেষের দিকে বাংলার হিন্দু সমাজের মধ্যে যে সমাজবিন্যাস ঘটে, তাতে মধ্যস্বত্বভোগী, সাহেবদের দালালি ক্রা মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে। উনিশ শতকের প্রথমের দিকে এই সমাজ বিন্যাস ও পরিবেশ যেমন ছিল, তাতে একটা নতুন হাওয়া বইতে লাগল।

এই নতুন যুগের হাওয়া বিদ্যাসাগরের মধ্যেও লেগেছিল ঠিকই, কিন্তু এর ফল নব্যযুগের অন্যান্যদের থেকে অনেকটাই আলাদা হয়েছিল। হিন্দু কলেজে ইংরেজি শিক্ষা বা যা দেশী তা-ই পরিত্যাজ্য, এমন ধ্যান ধারণার থেকে বেরিয়ে সমাজকে অন্য ছাঁচে ফেলেছিলেন।  একরকম একার উদ্যোগেই তিনি জেলায় জেলায় আধুনিক স্কুল স্থাপন করা, মাতৃভাষায় বিজ্ঞান শিক্ষা সবটাই করেছিলেন।

তবে তাঁর প্রধান পদক্ষেপ ছিল বিধবা বিবাহ প্রচলন। রামমোহন রায়ের সতীদাহ প্রথা রদের পরই যে বড় পদক্ষেপ বাংলায় নেওয়া হয়, তা ছিল বিধবা বিবাহের প্রচলন। সামাজিক ক্ষেত্রে তিনি যা যা সংস্কার করেন, এর কেন্দ্রে ছিল তাঁর নারীদের প্রতি দরদি মনোভাব। বিধবা নারীদের প্রতি সমাজ কেমন ব্যবহার করে, তা তিনি ছোটবেলাতেই দেখেছিলেন। এই কারণেই তিনি বুঝছিলেন যে বিধবা বিবাহ আইন প্রবর্তন করতে গেলে শাস্ত্রসিদ্ধতা ও আইন প্রণয়ন, দুইয়েরই প্রয়োজন।

বিধবাবিবাহ বিষয়ক ‘প্রথম প্রস্তাব’-এর দ্বিতীয় অনুচ্ছেদেই তিনি জানিয়েছেন, “যদি, যুক্তি মাত্র অবলম্বন করিয়া ইহাকে কর্তব্য কর্ম বলিয়া প্রতিপন্ন কর, তাহা হইলে, এতদ্দেশীয় লোকে কখনই ইহা কর্তব্য কর্ম বলিয়া স্বীকার করিবেন না। যদি শাস্ত্রে কর্তব্য কর্ম বলিয়া প্রতিপন্ন করা থাকে, তবেই তাঁহারা কর্তব্য কর্ম বলিয়া স্বীকার করিতে ও তদনুসারে চলিতে পারেন। অতএব, বিধবাবিবাহ শাস্ত্রসম্মত বা শাস্ত্রবিরুদ্ধ কর্ম, ইহার মীমাংসাই সর্বাগ্রে আবশ্যক”।

বিধবাবিবাহবিষয়ক ‘প্রথম পুস্তক’টি ছাপা হলে বাংলাদেশের হিন্দুসমাজে বিরোধিতা, কটুকাটব্য, ব্যঙ্গ, এমনকি ‘সং’-যাত্রা প্রভৃতি নানা রূপে রক্ষণশীলরা ফেটে পড়লেন, অনেকে শাস্ত্রীয় কূটপ্যাঁচেও মেতে উঠলেন। এরপর এর জবাব দিতে ১৮৫৫ সালের অক্টোবর মাসে ‘দ্বিতীয় পুস্তক’টির অবতারণা, যা প্রথমটির তুলনায় আয়তনে অনেক বড়। এখানে ‘ধর্ম’কেও ঠুকে তিনি লিখেছেন, “হা ধর্ম! তোমার মর্ম বুঝা ভার! কিসে তোমার রক্ষা হয়, আর কিসে তোমার লোপ হয়, তা তুমিই জান”!  এরপর, একদম শেষের লাইনে রয়েছে মেয়েদের জন্য এই হতাশোক্তি: “হা অবলাগণ! তোমরা কি পাপে, ভারতবর্ষে আসিয়া, জন্ম গ্রহণ কর, বলিতে পারি না”!

বিদ্যাসাগর মশাইয়ের সময় বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের পোশাকে ছিল নানান বিন্যাস। বিদ্যাসাগরের অকৃত্রিম বন্ধু মধুসূদন পোশাক ও চলাফেরায় ছিলেন পুরোদস্তুর সাহেব। বিদ্যাসাগর ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকার সূত্রে ঠাকুরবাড়ির সাংস্কৃতিক কাজকর্মে যুক্ত হয়ে পড়েন এবং ১৮৫৮ সালে সম্পাদনার দায়িত্ব নেন। সেই সময় মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের চোগা-চাপকান বা পাগড়ি কিংবা জ্যোতিরিন্দ্রনাথের পায়জামার সঙ্গে এক খণ্ড কাপড় জুড়ে করা মালকোঁচা-পায়জামা, মাথায় শোলার টুপির সঙ্গে পাগড়ির মিশেলে তৈরি শিরোভূষণ বিদ্যাসাগরকে একটুও প্রভাবিত করতে পারেননি।

বিদ্যাসাগর চিরকাল চটিজুতো পায়ে দিতেন, মোটা চাদর গায়ে দিতেন, পূজারি পুরোহিতদের মতো মাথা কামাতেন, চিঠির শিরোনামে লিখতেন ‘শ্রীদুর্গা শরণং’, ‘শ্রীশ্রীহরি সহায়’। এ সবের মধ্যে দিয়েই প্রকাশ পেত তাঁর তেজোদ্দীপ্ত স্বদেশিয়ানা। আত্মাবমাননার বিনিময়ে অনুগ্রহ লাভ তাঁর কাছে ছিল ঘৃণার বিষয়।

তখন বাংলার ছোটলাট ছিলেন হ্যালিডে সাহেব। এ দেশের মেয়েরা যাতে লেখাপড়া শিখতে পারে, সে বিষয়ে তিনি ‍উদ্যোগী হলেন। শিক্ষার ‍উন্নয়ন ও বিস্তার নিয়ে আলোচনার জন্য মাঝে মাঝে হ্যালিডে সাহেব বিদ্যাসাগরকে ডেকে পাঠাতেন। বিদ্যাসাগর যেতেন নিজস্ব পোশাকে। তাঁর পরনে থানধুতি, গায়ে বিদ্যাসাগরী চাদর, পায়ে তালতলার চটি। হ্যালিডে সাহেবের অনুরোধে বিদ্যাসাগর দুই-তিন বার পেন্টুলুন চোগা চাপকান পরেছিলেন  যা তাঁর জন্য ছিল অত্যন্তই অস্বস্তিকর।

এই পোশাকে সকলের চোখ এড়িয়ে ছোট লাটের বাড়ি পৌঁছন বিদ্যাসাগর। ছোটলাটকে সরাসরিই বলেন, এইভাবে সঙ সেজে আসা সম্ভব নয়, তাই এটাই শেষ সা‌ক্ষাৎ। হ্যালিডে সাহেব তাঁকে আশ্বস্ত করে বললেন, পণ্ডিত যে পোশাকে আসতে চান, সেই পোশাকে আসবেন। শেষজীবনে চিকিৎসকের কথায় মাঝে মাঝে ফ্ল্যানেলের জামা ও ‍উড়ানি ব্যবহার করতে হয়েছে।

You might also like
Comments
Loading...