অফবিট

কট্টর বামপন্থী, রাজনীতিতে আপোস করার ঘোর বিরোধী! ‘শিবির বদলকে ঘৃণা করি’, বলেছিলেন তরুণ মজুমদার

সালটা তখন ২০১২। তার বছর খানেক আগেই নতুন সরকার পেয়েছে বাংলা। বামেদের ৩৪ বছরের শাসনকালের অবসান ঘটিয়ে তৃণমূল জায়গা করেছে পশ্চিমবঙ্গের গদিতে। সেই সময় শ্রীরামপুরে বামপন্থী গণসংগঠনগুলি আয়োজন করেছে একটি রক্তদান শিবিরের। সেই অনুষ্ঠানেই একজন তরুণ মজুমদারকে প্রশ্ন করে ফেলেন যে সকলেই তো শিবির বদল করছেন, তাহলে তিনিও কী তাই-ই করবেন?

একথা শুনে কার্যত রেগেই যান বছর ৮০-এর সেই বৃদ্ধ। হঠাৎই চেয়ার ছেড়ে উঠে বলেন, “শিবির বদলকে ঘৃণা করি”। আসলে, বাম আমলে অনেক বুদ্ধিজীবীদেরই দেখা যেত নন্দনে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে গার্সিয়া মার্কেজ আওড়াচ্ছেন। তাদের মধ্যে তরুণ মজুমদারও ছিলেন একজন। তবে পরবর্তীতে সেই আড্ডা দলের অনেকেই ধীরে ধীরে নিজেদের পথ পরিবর্তন করে নিলেও, তরুণ মজুমদার কিন্তু তা করেন নি।

অনেকের মতেই রাজনীতিতে যখন মতাদর্শ বিষয়টি এখন আর নেই। সেই কারণেই এত এত দল বদলের ঘটনা। কিন্তু সেই আবহে গা ভাসান নি তরুণ মজুমদাররা। কারণ তারা যে চিরকালের ব্যতিক্রম।

অনেক কাল ঋত্বিক ঘটক বলেছিলেন যে তিনি রাজনৈতিক কারণে ছবি বানান। ঋত্বিক ঘটক কোনও দিনই স্পষ্ট কথা বলতে কষ্ট পেতেন না। তিনি বলতেন, “মানুষের কথা বলার জন্য সিনেমাই আমার কাছে সেরা মাধ্যম। যেদিন মনে হবে এর চেয়ে ভাল হাতিয়ার পেয়ে গিয়েছি, সেদিন সিনেমাকে লাথি মেরে চলে যাব”। ঠিক তেমনই তরুণবাবুর সিনেমাও যেন ছিল মানুষের কথা নিয়েই।

২০০৭ সালে নন্দীগ্রাম পর্বের সময় কলকাতায় নানান বুদ্ধিজীবীরা যখন বাংলার রাজনীতিতে মিছিল, পাল্টা-মিছিল করে মাইলফলক তৈরি করছেন, সেই সময় কিন্তু তরুণ মজুমদার বামেদের পক্ষেই হেঁটেছিলেন। সেদিন সেই বামেদের পাশে দাঁড়ানো অনেকেই একসময় পাশ থেকে সরে গেলেও, তরুণবাবুর অবস্থান ছিল স্থির। ওই যে, তিনি যে চিরকালের ব্যতিক্রমী।

২০০৭ সালে জীবনানন্দ সভাঘরে বেশ মজার ছলেই এক কবির উদ্দেশে তরুণ মজুমদার বলে উঠেছিলেন, “আমি খুব একটা আধুনিক নই। আমি খুব একটা সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়েও চলতে পারি না। তাই আমি ওঁদের মতো বদলাতে পারি না”

বাংলার রাজনীতিতে হিংসা, ভোটের নামে প্রহসন নতুন কোনও ঘটনা নয়। তবে বাংলার রাজনীতিতে যেটা ছিল না, সেটা হল আয়ারাম-গয়ারামের সংস্কৃতি। তাই জন্যই হয়ত কাটোয়ার সেই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক যিনি নিজের কৈশোরে ইন্দিরা গান্ধীকে এশিয়ার মুক্তিসূর্য আখ্যা দিয়েছিলেন, মৃত্যু পর্যন্ত সেই স্থানেই অবিচল থেকে গিয়েছেন তিনি। তাই তো বাংলার রাজনীতিতে এত দলাদলি, দলবদল, হিংসার রাজনীতির মধ্যেও তরুণ মজুমদারের মতো মানুষরা এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতোই চিরকাল জ্বলজ্বল করেছেন আর ভবিষ্যতেও করে যাবেন।

Related Articles

Back to top button