বিনোদন

বোকাবাক্সকে পিছনে ফেলে ইউটিউব-ই কি তবে এখন বিনোদনজগতের শেষ কথা?

“এই দুনিয়া ঘোরে বন-বন-বন-বন , ছন্দে ছন্দে কত রং বদলায় ! রং বদলায় !” — বর্তমানে বাংলা বিনোদন জগৎ দাঁড়িয়ে এক বিচিত্র বিপ্লবের সন্ধিক্ষণে । ড্রয়িংরুমের বোকাবাক্সকে পিছনে ফেলে আমরা কি সত্যিই তবে এবার বন্দি হতে চলেছি মুঠোফোনের ইউটিউবে ! অঙ্কুশ বনাম কিরণ দত্ত ওরফে বং গাইয়ের বাকযুদ্ধ গত কয়েকদিনে এই প্রশ্নকে উস্কে দিয়েছে বারংবার । ঘটনার সূত্রপাত, একটি বিশেষ ইউটিউব চ্যানেলে সাক্ষাৎকার চলাকালীন বাংলা ছবির নায়ক অঙ্কুশের অনভিপ্রেত কিছু বক্তব্যের প্রেক্ষিতে যা নিয়ে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে ট্রোল করেন কিরণ দত্ত । পাল্টা দিতে ছাড়েননি ‘ কানামাছি ‘ ছবির নায়কও । দুতরফেই বিবৃতি-পাল্টা বিবৃতির ঝড় তোলেন সোশ্যাল সাইটে । লড়াই থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখতে পারেননি ইউটিউবার বা নায়কের ভক্তরাও , সব মিলিয়ে সোশ্যাল সাইটে যেন সীমান্তবর্তী কাশ্মীরের উত্তেজনা । দুইপক্ষই নিজেদের বিনোদনমাধ্যমের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে তৎপর । অঙ্কুশের মতে , হলে গিয়ে তিনশো টাকার টিকিট কেটে সিনেমা দেখা আর দুশো টাকার নেট প্যাক ভরে পাওয়া হাজার একটা অপশনের মধ্যে একটা ‘ সাবস্ক্রাইব ‘ বাটন প্রেস করার আবেগ কখনোই এক নয় ; তাই এগিয়ে সিনেমা । কিন্তু ভার্চুয়াল দুনিয়ায় ইউটিউবার কিরণ দত্তের সমর্থনে ওঠা টর্নেডোয় অনেকটাই কোণঠাসা নায়ক । আর এখানেই উঠছে প্রশ্ন । তবে কি জায়গা হারাচ্ছে বড় পর্দা ? বিনোদন মানেই কি তবে মুঠোফোন ?

Check out best Bengal Football website

হার্ডকোর কমার্শিয়াল বাংলা ছবি রিমেকের ছত্রচ্ছায়ায় প্রথম আশ্রয় নেয় দুই দশকেরও বেশি সময় আগে । তারপর ধীরে ধীরে প্রচলিত প্রবাদই হয়ে দাঁড়ায় — মূলধারার নতুন কোনো বাংলা সিনেমা মানেই তা দক্ষিণী সুপারহিটের ফ্রেম টু ফ্রেম কপি । সেই রিমেকের  যুগেই ‘ কেল্লাফতে’ সিনেমা দিয়ে টলিউডে হাতেখড়ি অঙ্কুশের । কেরিয়ারগ্রাফের নব্বই শতাংশ জুড়েই তার রিমেক ছবি । দর্শকের চাহিদা মেনে প্রযোজকরাও একসময় পুরোপুরি ভরসা রাখতেন তামিল ছবির কার্বন কপিতে । লক্ষ্মীলাভও চলত ঝাঁপি উপুড় করে । কিন্তু বর্তমানে সময়ের সাথে সাথে রিমেক হারাচ্ছে তার বাজার । তামিল ছবিসুলভ  ‘ ফার লার্জার দ্যান লাইফ ‘ ইমেজ মার্কা হিরো , অবাস্তব আকশন সিকোয়েন্স , ঝাঁ চকচকে ফরেন লোকেশন সত্ত্বেও শহরের পাশাপাশি গ্রামের মানুষও ইদানিং হলবিমুখ ।

 

একদা মানুষের জীবনে বিনোদনের মাধ্যম ছিল কম । টেলিভিশন এসে পৌঁছোয়নি ঘরে ঘরে , মুঠোফোনের ধারণা তো নেহাতই কল্পবিজ্ঞানের পাতায় । সেসময় দুপুরের খাওয়ার পর বা সন্ধ্যায় কাজ থেকে ফিরে সিনেমা হলকেই আমজনতা বেছে নিত বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে । পিঁপড়ের সারির ন্যায় ভিড় জমত হলের বাইরের টিকিট কাউন্টারে । টিকটক বা ফেসবুকে ছবি আপলোড করে সে যুগে নিজেকে স্টার ভাবতে শেখেনি মানুষ । স্টারডমের সংজ্ঞা ছিল অন্য — যাকে ধরা যায় না , ছোঁয়া যায় না ; শুধু দেখা যায় অনেকটা নীচ থেকে । তাই তো জ্যেষ্ঠভ্রাতার মতো শাসন করে অভিনেতা শুভেন্দুকে পেট্রোলপাম্পে গাড়ি থেকে নামতে নিষেধ করেন মহানায়ক উত্তমকুমার , করমর্দনের দূরত্বে স্বপ্নের নায়ককে দেখার পর হয়তো টিকিট কেটে হলমুখী হওয়ার মানসিকতাই হারিয়ে ফেলবে সেই পেট্রোলপাম্প কর্মী — আশঙ্কা ছিল এমনই । পৃথিবীর বার্ষিক গতির সাথে পাল্লা দিয়ে বদলেছে আজ বিনোদনজগতের নিয়মও । তাই তো সিনেমা রিলিজের আগেই পোস্ট-প্রোডাকশনে হিরো হাজির হন ছোটোপর্দা বা ইউটিউব চ্যানেলে । কখনও কখনও সিনেমার প্রচারে মিশে যান মানুষের ভিড়ে । উদ্দেশ্য , বক্সঅফিসে লক্ষ্মীলাভ ।

ব্যস্ততার যুগে তিন ঘন্টার বড় পর্দার তুলনায় মানুষ ক্রমশ বেছে নিচ্ছে ছয় ইঞ্চির মায়াবি স্ক্রিনকেই । হলে গিয়ে সিনেমা দেখার অভ্যাসকে প্রতিস্থাপিত করছে নিজের সময়ানুযায়ী ইচ্ছেমত ডাউনলোড করে সিনেমা দেখার সুযোগ । কন্টেন্টনির্ভর কিছু ছবি দর্শক পেলেও , প্রযোজকদের ভরসার সবেধন নীলমণি যে কমার্শিয়াল ছবি , তার টার্গেট অডিয়েন্স আজ পেয়ে গেছে বিনোদনের বহুমুখী অপশন । দশ মিনিটের রোস্টিং ভিডিও বা সাড়ে সাত মিনিটের ট্রল — বিনোদনের বিচিত্র বাহার সাজিয়ে বসে আছে নানান ইউটিউব চ্যানেল । দিনমজুর থেকে দেশজোড়া খ্যাতিসম্পন্ন ব্যবসায়ী ; আর্থিক  ক্ষমতা নির্বিশেষে সুযোগসুবিধা , সময় , পছন্দ অনুযায়ী মনোরঞ্জনের মনোহারী যেন ইউটিউব । কোথাও যেন হলে গিয়ে সিনেমা দেখা আজ বেশ কিছুটা ব্যাকফুটে । সে কারণেই হয়তো টলিস্টার অঙ্কুশের তুলনায় বেশি সমর্থন পান দেড় লক্ষ সাবস্ক্রাইবার সমন্বিত বং গাই ।

তবে ইউটিউব অডিয়েন্সের একটা বড় অংশই জেন ওয়াই । তাদের আবেগের ভাঁড়ারে অভিজ্ঞতার দৈন্য যেমন প্রকট , তেমনই বুদ্ধির পরিপক্বতাও অনেক ক্ষেত্রেই অপ্রতুল । আর ট্রলিংয়েরও একটা সীমা থাকা উচিত । নয়ের দশকের যে সকল সিনেমা নিয়ে বা সিনেমার যে সকল অংশ নিয়ে বং গাই ট্রল করে থাকে , তার অধিকাংশই তৎকালীন ব্লকব্লাস্টার অর্থাৎ সমসাময়িক ক্ষেত্রে আমজনতার  রুচিশীলতার কাছে সিনেমাগুলি ছিল সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ।

 

সময়ের স্রোতে আজকের ট্রেন্ডিং পরিণত হয় কালকের ব্যাকবেঞ্চারে । ১.৫ মিলিয়ন সাবস্ক্রাইবার প্রাপ্ত কিরণ দত্তের সফলতম কাজগুলিও হয়তো  কালের নিয়মে দু’যুগ পরে স্থান পাবে মানুষের অপছন্দের তালিকায় ; হয়ে উঠবে ব্যঙ্গবিদ্রুপ মূল আকর্ষণ । মানুষের পছন্দ এমনই এক অজ্ঞাত রাশি যাকে কোনো প্যারামিটারে বাঁধা যায় না , তাই তো বিনোদনজগতের সাফল্য বড়ই সাময়িক । সফলতার গ্যাসবেলুনে চড়ে নিজেকে অভিকর্ষের উর্ধ্বে ভাবার মানসিকতা থাকলে পতনের আঘাতটাও যে হবে বড্ড জোরালো ।

নেটফ্লিক্স বা হইচই-এর অনুগামী সংখ্যায় যে ভরা কোটাল এসেছে ; তাতে এ কথা অস্বীকারের কোনো জায়গা নেই , বিনোদন দুনিয়ায় সিনেমা বা টিভি সিরিয়ালের বেশ বড় রকমের প্রতিদ্বন্ধী বর্তমানে ইউটিউব চ্যানেল বা ওয়েব সিরিজ । বড় পর্দার ততোধিক বড় তারকারাও অভিনয় করছেন ওয়েব সিরিজে । হয়তো সেইদিন খুব বেশি দূরে নয় যখন ইউটিউব বা ওয়েবই হয়ে উঠবে বিনোদনের মূল মাধ্যম কিংবা একশো টাকার বিনিময়ে ডাউনলোডের মাধ্যমে বেডরুমে শুয়েই সিনেমাপ্রেমী দেখে নেবে জমজমাট পাঁচটা সিনেমা । হলকেন্দ্রিক বাণিজ্যের বদলে নেটই হয়তো সিনেমাশিল্পের আগামী ভাগ্যলিখন । হল ভেঙে গড়ে উঠবে মাল্টিস্টোরেড বিল্ডিং । আজকের মানুষ ‘ স্পুন ফিডিং’ -এ বেশি বিশ্বাসী । তাই হাতের কাছে ওয়েব বা ইউটিউব থাকতে সময় ও কায়িক শ্রম খরচ করে নিকটবর্তী সিনেমা হলে যেতেও যে নিমরাজি একটা বড় সংখ্যক দর্শক —  সেকথা নতুন করে বলাই বাহুল্য ।

তবে এ লড়াই দেখে আজ মনে পড়ে যাচ্ছে এক বিশেষ গল্প । একদা অস্কারজয়ী বাঙালি চিত্রপরিচালক সত্যজিৎ রায় নিজে থেকে উৎসাহী হয়ে অভিনেতা কৌশিক ব্যানার্জির কাছে ‘ বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না ‘ সম্পর্কে জানতে চান । ‘ পথের পাঁচালি’-র পরিচালকের মতে , একটা ছবি দেখতে যখন দিনের পর দিন কাতারে কাতারে মানুষ প্রতিটি শোতে ভিড় জমান হলে, তার অর্থ ছবিটির মধ্যে নিশ্চয়ই সম্মোহনী কিছু একটা আছে । কিন্তু দুঃখের বিষয় , এই ধরনের সকল ছবিই ‘ বং গাই ‘ -এর  ব্যঙ্গের তালিকায় । বাংলা সিনেমার স্বল্প পরিসরের অডিয়েন্স মার্কেটের প্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে ‘ আমাজন অভিযান’ , ‘ চাঁদের পাহাড় ‘ -এর মতো ছবি তৈরির প্রয়াস অকুণ্ঠ প্রশংসার দাবি রাখলেও কিরণ দত্ত হাঁটেন উল্টোপথে ।

 

যুগের নিয়মে আজকের ট্রাজেডি , এক যুগ পরের কমেডি । আজ যে রাজা , কাল সে ফকির মজার দুনিয়ায় । তাই তো টেলিফোন বুথ বা কোডাক ফিল্ম আজ রূপান্তরিত ফসিলে । প্ল্যাটফর্ম নির্বিশেষে বিনোদন দুনিয়ার সকলেরই উচিত একে অপরের কাঁধে আস্থার হাত রাখা । বিনোদন জগতের আসল লড়াই তো বাংলা ভাষাকে বাঁচানোর লড়াই । সেই লড়াইতে কখনও অঙ্কুশ সেঞ্চুরি করে এগিয়ে দেবে বাংলাকে , কখনও বা কিরণ দত্ত হাল ধরবে মিডল অর্ডারে । তাই ব্যক্তিক্ষেত্রের সাফল্য বা ব্যর্থতাকে খেরোর খাতায় না তুলে নিজের কাজের প্রতি সততা আর বাংলা ভাষার উন্নতিকল্পে দৃঢ়সংকল্পতাই এ সকল তারকাদের কাছে একান্ত কাম্য । তাতেই হয়তো সর্বাধিক সমৃদ্ধ হবে আমাদের সোনার বাংলা তথা বাঙালি দর্শক ।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button